• রোববার ২৩ জুন ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ৯ ১৪৩১

  • || ১৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

ঝালকাঠি আজকাল

খুনিদের সঙ্গে সংলাপ নয় : সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

ঝালকাঠি আজকাল

প্রকাশিত: ১ নভেম্বর ২০২৩  

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  প্রশ্ন করে বলেছেন, কার সঙ্গে সংলাপ করব? বিরোধী দল কে? সংসদীয় পদ্ধতিতে বিরোধী দলের সংজ্ঞা আছে। সংসদে যাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি আছে, তারাই প্রকৃত বিরোধী দল। এর বাইরে বিরোধী দল গণ্য হয় না, আমেরিকাতেও হয় না। তাহলে কার সঙ্গে সংলাপ করব? খুনিদের সঙ্গে কীসের সংলাপ? গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে এ প্রশ্ন করেন তিনি।
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে তার সা¤প্রতিক ৩ দিনের সরকারি সফরের ফলাফল সম্পর্কে গণমাধ্যমকে অবহিত করতে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রধানমন্ত্রী। বিকাল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন সরকারপ্রধান।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস গতকাল নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সংলাপের কথা জোর দিয়ে বলেছেন- প্রশ্নোত্তর পর্বে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জবাবে তিনি বলেন, যেভাবে পিটিয়ে পিটিয়ে পুলিশকে হত্যা করেছে, ওই খুনিদের সঙ্গে আবার কীসের বৈঠক, খুনিদের সঙ্গে কীসের আলোচনা? যারা এভাবে মানুষকে হত্যা করতে পারে, যারা আমাদের সমস্ত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ধ্বংস করতে পারে, তাদের সঙ্গে ডায়ালগ? সে (পিটার হাস) বসে ডিনার খাক, সে বসে ডায়ালগ করুক।
ট্রাম্প-বাইডেনের সংলাপ হলে আমিও করব : এ সময় আমেরিকার উদাহরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা ক্যু করার পর বলে ডায়লগ করতে হবে? ট্রাম্প সাহেবের সঙ্গে কি বাইডেনের ডায়লগ (সংলাপ) হয়েছে? যেদিন ট্রাম্পের সঙ্গে বাইডেনের সংলাপ হবে সেদিন চিন্তা করা যাবে। তখন আমিও করব। তাদের সব কর্মকাণ্ড রেকর্ড করা আছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যারা নির্বাচন বানচাল করবে তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেবে এমনটি বলেছিল। কিন্তু এখন কারা নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে এটি সবাই দেখছে। কিন্তু এখন তাদের বিরুদ্ধে স্যাংশন না দিয়ে ডায়লগ করার কথা বলছে। এদের নীতি নিয়েই তো প্রশ্ন উঠেছে।
তিনি বলেন, এটা আমাদের দেশ। আমরা স্বাধীনতা এনেছি রক্ত দিয়ে। কাজেই আমরা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। এ কথাটা মনে রাখা উচিত। শেখ হাসিনা বলেন, ওই খুনিদের সঙ্গে ডায়ালগ, এটা বাংলাদেশের মানুষও চাইবে না। বরং বাংলাদেশের মানুষ এখন তাদের ঘৃণা করে। বিএনপি-জামায়াতকে এখন ঘৃণা করে তাদের এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য। যেটুকু অর্জন করেছিল তারা, আমরাই সুযোগ দিয়েছিলাম, সেটা তারা হারিয়েছে। এখন মানুষের কাছে তারা ঘৃণার পাত্র, দুর্নীতির পাত্র।
বিএনপি একটি সন্ত্রাসী দল : বিএনপি একটি সন্ত্রাসী দল তারা আবারো প্রমাণ করেছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ইসরায়েল যেভাবে হাসপাতালে হামলা করেছে, তেমনি এখানেও বিএনপি হামলা করেছে।? মাঝখানে কিছুদিন বিএনপি রাজনৈতিকভাবে কর্মসূচি করছিল এবং সরকার তাদের কোনো বাধা দেয়নি। তাদের ওপর একটা শর্ত ছিল, তারা অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুর করবে না। তারা (বিএনপি) যখন সুষ্ঠুভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি করছিল তাতে কিন্তু মানুষের একটু আস্থা-বিশ্বাসও তারা ধীরে ধীরে অর্জন করতে শুরু করেছিল। কিন্তু ২৮ অক্টোবর বিএনপি যেসব ঘটনা ঘটাল, বিশেষ করে যেভাবে পুলিশকে হত্যা করেছে, মাটিতে ফেলে যেভাবে কোপাল, সাংবাদিকদের যেভাবে পেটাল, এ ঘটনার পর জনগণের ধিক্কার ছাড়া বিএনপির আর কিছুই জুটবে না। সরকারপ্রধান বলেন, শুধু তাই নয়; হাসপাতালে ঢুকেও তারা হামলা করেছে। সেখানেও পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েল যেভাবে ফিলিস্তিনে হাসপাতালে হামলা করছে, নারী-শিশুদের হত্যা করছে, এর সঙ্গে তো বিএনপির হামলার কোনো তফাৎ দেখি না।
বিএনপি-জামায়াতের নাম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সন্ত্রাসী এবং বিএনপি যে সন্ত্রাসী দল, সেটা আবার প্রমাণ করল। কানাডার আদালত এ বিষয়টি কয়েকবার বলেছে। সন্ত্রাসী দল হিসেবে তাদের কর্মীরা কানাডায় প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এদের মধ্যে কোনো মনুষ্যত্ববোধ নেই। তাদের সঙ্গে যতই ভালো ব্যবহার করি না কেন, এদের স্বভাব বদলাবে না। সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদে এরা বিশ্বাস করে। অবৈধ ক্ষমতাটাই এরা ভালো বোঝে। তিনি বলেন, আর এরা নির্বাচন চায় না। এরা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়। মানুষকে কষ্ট দেয়াটাই এদের চরিত্র। এদের বিষয়ে বলার কিছু নেই। সবাই আমাদের প্রশংসা করে।
সরকারপ্রধান আরো বলেন, আমরা যখন টানেল উদ্বোধন করেছি- বিএনপি তখন পুলিশের ওপর হামলা করেছে, সাংবাদিকের ওপর হামলা করেছে। লালমনিরহাটে যুবলীগ কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। হত্যা করা এদের উদ্দেশ্য। ২০১৩-১৪ এবং ২০১৫ এই তিনটি বছর তারা সন্ত্রাস চালিয়েছে। আবার সন্ত্রাসের রাজনীতি করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন মানবাধিকার কোথায়? এখন ৪০-৪৫ জন সাংবাদিকদের পেটাল; আগুন দিল, পুলিশকে হত্যা করল, এখন তারা কোথায়? এখন তারা চুপ কেন? অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখন চুপ কেন? তাদের মানবিক বোধগুলো গেল কোথায়? দেশের বুদ্ধিজীবীরা চুপ কেন? সরকার প্রধান বলেন, যখন উপনির্বাচনে হিরো আলমকে কেউ মেরেছিল, তার বিচার দাবি করেছিল। এখন যখন পুলিশকে পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হলো, তখন কেন বিচারের দাবি করে না। যারা সাংবাদিকদের সুরক্ষার কথা বলে, আজকে যখন এত সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হল, তারা চুপ কেন?
যে হাত আগুন দেবে, ওই হাত পুড়িয়ে দেয়া উচিত : সন্ত্রাসীদের কীভাবে শিক্ষা দিতে হয় এটা আমরা জানি মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেভাবেই এদের শিক্ষা দেব। শঠের সঙ্গে শঠের মতোই আচরণ করতে হবে। জনগণ ওদের সঙ্গে নেই। জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। আশা করি, বিএনপির আচরণ পরিবর্তন হবে। তা না হলে তাদের পরিস্থিতি খারাপ হবে। তাদের নেতা কে প্রশ্ন রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের কোনো নেতা নেই, আছে শুধু মাইকবাজ। যে হাত দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়, ওই হাত পুড়িয়ে দেয়া হলে, তখন কিছুটা শাস্তি হতো। এখন কিছু করতে এলে জনগণ প্রতিহত করবে।
কারো চোখ রাঙানো পরোয়া করি না : প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন

যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে। কেউ থামাতে পারবে না। কে নির্বাচনে এলো, কে এলো না, কে চোখ রাঙালো এসব নিয়ে পরোয়া করি না। শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, ?মানুষের জীবনমান পরিবর্তন হয়েছে, উন্নত হয়েছে। আগামী নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক কোনো চাপ আছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন কোনো চাপ নেই যেটা শেখ হাসিনাকে দিতে পারে, এটা মাথায় রাখতে হবে। কে কি চাপ দিল, না দিল এটাতে কিছু আসে যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সেই কথিত উপদেষ্টা জাহিদুল ইসলাম মিয়া ওরফে আরেফিকে ছাড়া হচ্ছে না বলে জানান প্রধামন্ত্রী। তিনি বলেন, ওই ব্যক্তিকে (জাহিদুল ইসলাম মিয়া) জিজ্ঞাসা করা হবে। তাকে ছাড়া হচ্ছে না, ছাড়া হবেও না।
বিশ্বের অন্য দেশের মতোই নির্বাচন : প্রধানমন্ত্রী বলেন, অস্ট্রেলিয়া, ইন্ডিয়া, কানাডা বা ইংল্যান্ডে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও সেভাবে নির্বাচন হবে। এবারের নির্বাচনকালীন সরকারও ২০১৮ সালের মতোই হবে। ২০১৪ সালে কিছু মন্ত্রী অন্যান্য দল থেকে নিয়োগ করেছিলাম। এরপর ২০১৮ সালে আর সেই পদ্ধতি করিনি। যেটা অন্যান্য দেশে হয়, এবারো সেভাবেই হবে। সরকার থেমে থাকবে না। সরকারের দৈনন্দিন যে কাজগুলো, রুটিন কাজগুলো করতে হবে। আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার কে হবে না হবে, সেদিকে আমরা যাচ্ছি না। আমরা যেভাবে চলার, অন্যান্য দেশ, আমি এটা ইংল্যান্ডেও আলাপ করেছি, তাদের দেখেছি; অস্ট্রেলিয়া, কানাডা যেসব দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র আছে সেভাবেই করা হবে। অর্থাৎ সে সময় আমরা যারা থাকব, ওই আমরাই নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে আমাদের রুটিন ওয়ার্ক, দায়িত্বপালন, দৈনন্দিন কাজকর্ম করব। যাতে সরকার অচল হয়ে না যায়, সেটা আমরা করব।
নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভার আকার কেমন হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আকার-বিকার সেটা যখন যেরকম হবে দেখা যাবে। আকার ছোট করলে যেটা সমস্যা হয় ২০১৪ সালে দেখেছি অনেক মন্ত্রণালয়ের কাজ আর হয় না। কাজগুলো বাধাগ্রস্ত হয়ে যায়। কাজগুলো যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, আমাদের উন্নয়নের ধারাটা যাতে অব্যাহত থাকে। আমাদের সেটাই প্রচেষ্টা। তিনি বলেন, আমাদের আরপিও অনুযায়ী যখনই নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হবে এবং নমিনেশন সাবমিট হবে তখন থেকে আর সরকারি সুযোগ-সুবিধা মন্ত্রীরা ব্যবহার করতে পারবে না। একজন প্রার্থী হিসেবেই ভোট চাইতে হবে।
ব্রাসেলস সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে : ব্রাসেলস সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব এ সফরকালে নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৩৫০ মিলিয়ন ইউরোর একটি ঋণ সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তিনি বলেন, ইউরোপীয় কমিশন ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৪৫ মিলিয়ন ইউরোর একটি অনুদান চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও ইসির মধ্যে একটি ১২ মিলিয়ন ইউরোর অনুদান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া এই সফরে বাংলাদেশ সরকার এবং ইসি বাংলাদেশের সামাজিক খাতে ৭০ মিলিয়ন ইউরোর পাঁচটি ভিন্ন অনুদান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সরকার প্রধান বলেন, কোভিড, রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, অবরোধ ও পাল্টা অবরোধের কারণে অর্থনৈতিক অভিঘাত বিবেচনায় নিয়ে আমি বাংলাদেশসহ অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে এলসিডি উত্তরণ পরবর্তী ৩ বছরের পরিবর্তে ৬ বছরের জন্য বাণিজ্য সুবিধা ২০৩২ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে অনুরোধ জানাই।
প্রসঙ্গত, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনের আমন্ত্রণে গত ২৪ অক্টোবর ব্রাসেলসে যান শেখ হাসিনা। সফরকালে সাইডলাইনে ইউরোপীয় দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বৈঠক করেন। সফর শেষে ২৭ অক্টোবর ঢাকায় ফেরেন প্রধানমন্ত্রী।

 

ঝালকাঠি আজকাল