রোববার   ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯   ভাদ্র ৩১ ১৪২৬   ১৫ মুহররম ১৪৪১

ঝালকাঠি আজকাল
৩৯

৩৫ গডফাদারের নিয়ন্ত্রণে ভেজাল প্রসাধনীর বাজার,র‌্যাবের নজরদারি

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

দেশের ভেজাল প্রসাধনীর রমরমা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে ৩৫ গডফাদার। মূলত এই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট দেশের বাইরে থেকে নকল প্রসাধনী তৈরি করে এনে বা বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডেড পণ্যের মোড়ক বা কৌটা হুবহু নকল করে তৈরি করে এনে তা আসল বলে চালিয়ে দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে, ভেজাল এই প্রসাধনী ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা ১ লাখ টাকায় ব্যবসা শুরু করেছিলেন তাদের কেউ কেউ এখন শত কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক। এ ব্যবসায় এতই লাভ যে, অসাধু ব্যবসায়ীরা লোভ সামলাতে না পেরে শাস্তি ভোগ করার পরও আবার ভেজাল ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন।

র‌্যাবের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ভেজাল প্রসাধনী ব্যবসায় জড়িত কয়েকজন গডফাদারের মধ্যে অন্যতম হলেন শ্যামল, বাবুল হাজী, রিপন ও বাবলু হাজী। এর মধ্যে রিপন ভারত থেকে বিশ্বখ্যাত পন্ডসের মেয়াদোত্তীর্ণ ক্রিম বাংলাদেশে এনে পুরনো মোড়কটি বদলে সেই কৌটায় স্থানীয়ভাবে নতুন মোড়ক লাগিয়ে তা বিক্রি করছেন। রিপনের সোয়ারীঘাটের সাত তলা বাড়ির ছাদে এই মেয়াদোত্তীর্ণ ক্রিমগুলোর মোড়ক লাগানোর কাজ চলছিল।

দুই মাস আগে র‌্যাবের অভিযানে বিষয়টি সামনে আসে। এ ছাড়া ভেজাল প্রসাধনীর আরেক হোতা মালিটোলার ময়না হাজী। সম্প্রতি এই ব্যবসায়ীর দুটি বাড়ির মোট ১৮টি কারখানা থেকে ভেজাল প্রসাধনসামগ্রী তৈরির উপকরণ জব্দ করা হয়। জব্দ উপকরণের মধ্যে ছিল ইউনিলিভার, স্কয়ার টয়লেট্রিজ, কোহিনূর কেমিক্যালসহ আমদানিকৃত বড় বড় ব্র্যান্ডের পণ্য; যা প্রকাশ্যে নকল করে বাজারজাত করা হচ্ছিল। জানা যায়, ইউনিলিভারের কারখানা ও প্রেস থেকে লেবেল, খালি বোতল, টিউব, কৌটা ও পাতাল ফয়েল চোরাই পথে এনে ভেজাল পণ্য তৈরি করা হচ্ছিল। তবে ভেজাল প্রসাধনসামগ্রী বাজারজাতকরণের মূল হোতা বাবলু হাজী। তিনি হচ্ছেন চকের (চকবাজার) কসমেটিকস সমিতির সভাপতি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তার বিরুদ্ধে চীন থেকে বিপুল পরিমাণ নকল প্রসাধনসামগ্রী আমদানির অভিযোগ আছে। তবে দ্রুত স্থান বদলের কারণে এই ব্যবসায়ী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরোয়ার আলম বলেন, ‘গত দুই বছরে বিভিন্ন অভিযানে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৩৮ জন ভেজাল প্রসাধনী ব্যবসায়ীকে জেল-জরিমানা দিয়েছি। এতে আশানুরূপ না হলেও ভেজাল প্রসাধনীর ব্যবসা কিছুটা কমেছে। তবে ভেজাল এই ব্যবসায় মূল হোতা এর আমদানিকারকরা। তারাই এর গডফাদার। বর্তমানে ৩৫ জন গডফাদারের মধ্যে আমরা ১৫ জনকে গ্রেফতার করেছি। বাকিদের ধরার চেষ্টা চলছে।’ মূলত চীন থেকে বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের প্রসাধনীর কৌটা বা পাত্র নকল করে বানিয়ে এনে তা কেরানীগঞ্জ বা চকবাজারের গোডাউনে রিফিল করে বাজারে আসল পণ্য বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ব্র্যান্ডের শ্যাম্পু ট্রেসেমে’র একটি বোতল চীন থেকে হুবহু নকল করে বানিয়ে আনতে এসব ব্যবসায়ীর খরচ পড়ছে ১৫০ টাকা। কিন্তু বাজারে যদি এই শ্যাম্পু ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয় তাহলে সেই ব্যবসায়ীর প্রতি বোতলে ৩৫০ টাকা লাভ হচ্ছে। একইভাবে চীন থেকে আরেকটি বিশ্বখ্যাত পণ্য ডাভের নকল সাবান তৈরি করে এনে তা বাজারে আসল ডাভ সাবান বলে বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ এই সাবানটির মান দেশের হুইল সাবানের চেয়েও খারাপ। আবার বিখ্যাত কসমেটিকস লোরিয়েলের পণ্যগুলোরও নকল চীন থেকে তৈরি করে এনে তা বাংলাদেশে আসল পণ্য বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে মানুষের ফেলে দেওয়া বিভিন্ন প্রসাধনীর পাত্রগুলো সংগ্রহ করে তা পরিষ্কার করে এতে ভেজাল প্রসাধনী পূর্ণ করে তা বিক্রি করা হচ্ছে।উদ্বেগের বিষয় হলো, ভেজাল এ পণ্যগুলো যে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জেই বিক্রি হচ্ছে এমন নয়, খোদ রাজধানী ঢাকার গুলশানের মতো অভিজাত এলাকাতেই দেদার ভেজাল প্রসাধনী বিক্রি হচ্ছে।

দুই সপ্তাহ আগে র‌্যাবের ভেজালবিরোধী এক অভিযানে গুলশান ডিসিসি মার্কেটের একটি কসমেটিকসের দোকানে অভিযান চালানো হলে দেখা যায় সেই দোকানটির অর্ধেক পণ্যই ভেজাল। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অনেক সময় খুচরা ব্যবসায়ীদের নকল পণ্য কিনতে বাধ্য করেন ভেজাল প্রসাধনীর আমদানিকারকরা। সে ক্ষেত্রে খুচরা ব্যবসায়ীরা পণ্যটি নকল বুঝতে পারলেও ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য এসব পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। মূলত চকবাজার, কেরানীগঞ্জ, মৌলভীবাজার, চকমোগলটুলি, উর্দু রোড, জিনজিরা, বেগমবাজার, কামালবাগ, ইসলামবাগ, বড় কাটারা, ছোট কাটারা ও কামরাঙ্গীর চরে ভেজাল প্রসাধনীর অসংখ্য কারখানা গড়ে উঠেছে। অপরাধীরা গোপনে ভেজাল পণ্য তৈরি করে সুযোগ বুঝে তা বাজারে ছেড়ে দেয়। আর এ পণ্যগুলো এত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হচ্ছে যে দেখে বোঝার উপায় নেই এসব পণ্য নকল না আসল।

এই বিভাগের আরো খবর