রোববার   ২৯ মার্চ ২০২০   চৈত্র ১৪ ১৪২৬   ০৪ শা'বান ১৪৪১

ঝালকাঠি আজকাল
৮৩৭

সাপে কামড়ালে যা করবেন এবং যা করবেন না

ঝালকাঠি আজকাল

প্রকাশিত: ৫ এপ্রিল ২০১৯  

শুরু হয়ে গিয়েছে গরমের মৌসুম। এখন গ্রামঅঞ্চলে সাপে কামড়ানো রোগী প্রচুর বেড়ে যায়।বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়
কৃষকেরা ক্ষেত-খামারে কাজ করতে গিয়ে সাপের কামড়ের স্বীকার হয়।প্রাথমিক চিকিৎসা এবং করণীয় ণা জানার কারণে মৃত্যু হয় অনেকের।
এজন্য আজকের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কিছু তথ্য দেয়ার চেষ্টা করব যেগুলো সবার জানা উচিত।

**সাপের কামড়ে বিষক্রিয়ার মাত্রাঃ
সাপের কামড়ে বিষক্রিয়া কতটুকু হবে তা কতগুলো বিষয়ের উপরে নির্ভর করে।যেগুলোর বিষয়ে জানা খুব জরুরী।

☞দেহের কাঠামোঃ
বয়স, পুষ্টি ইত্যাদির উপর বিষক্রিয়ার তীব্রতা নির্ভর করে। ছোটরা ক্ষতিগ্রস্ত বেশি হয়, কেননা ছোট শরীর বেশি মাত্রায় বিষ সহ্য করতে পারে না

☞কামড়ের স্থানঃ
দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বা চর্বিকলা প্রধান স্থানে কামড়ালে বিষক্রিয়া হতে সময় লাগে বা তত তীব্র হয় না। তুলনায় দেহকাণ্ড, মুখ বা সরাসরি রক্তনালিতে কামড়ালে বিষক্রিয়া দ্রুত বা তীব্র হয়। ফণার ছোবল প্রত্যক্ষ হলে তা আঁচড়ানো বা হাড়ে আঘাতের তুলনায় বিপজ্জনক হয়। দেখা গেছে সামান্য কাপড়চোপড় পড়ে থাকলেও তা অনেক পরিমাণে সুরক্ষা দেয়। এ ক্ষেত্রে সাপের ছোবলের ক্ষত তত গভীর হয় না। তাই বিষাক্ত সাপের কামড়েও এক পঞ্চামাংশ মানুষ বেঁচে যায়।

☞ সাপটি পূর্ণবয়স্ক কিনাঃ
চন্দ্রবোড়া সাপ বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর প্রয়োজনীয় ছ’গুণের বেশি বিষ ঢালতে পারে। বিশেষত এটি কামড়ানোর সময় কী পরিমাণ উত্তেজিত হয়েছিল (উত্তেজিত হলে বেশি বিষ ঢালবে), এর বিষদাঁত তাজা কিনা, এর বিষথলি ভর্তি ছিল কিনা ইত্যাদি বিষয়গুলি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ক্ষণ আগে খাবার ধরলেও একটি সাপের থলিতে যথেষ্ট বিষ থাকে এবং একটি ছোবলে সাপ সব বিষ উজাড় করে দেয় না।এক্ষেত্রে সাপ পূর্নবয়স্ক হলে এতে বিষ বেশি পরিমানে থাকে।যাতে ক্ষতির সম্ভাবনাও থাকে বেশি।

☞বিষাক্ত সাপের কামড়ের পর ক্ষতস্থানের নড়াচড়া হলে বিষ অনেক দ্রুত মাত্রায় শোষিত হয়। এই কারণে ক্ষতস্থানটিকে ঘিরে এমন ভাবে (স্প্লিট দিয়ে) বাঁধা হয় যাতে স্থানটি কোনও রূপ নড়াচড়া না হয়। এ ছাড়া কামড়ানোর স্থানে অন্য কোনও বাঁধনের কোনও গুরুত্ব নেই।

☞ কি কি লক্ষণ দেখা যায় সাপে কামড়ালেঃবিভিন্ন সাপের কামড়ে বিভিন লক্ষণ প্রকাশ পায়।গোখরা সাপ গ্রাম অঞ্চলে বেশি দেখা যায় তাই আমি শুধু গোখরোর কামড়ে কী লক্ষণ প্রকাশ পায় তা উল্লেখ করছি

গোখরো জাতীয় সাপের কামড়ে ক্ষতস্থানে ব্যথা বা ফোলা কম হয়। সাধারণত বিষধর সাপের কামড়ে দু’টি বিষদাঁত খুব স্পষ্ট ভাবে দেখা যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে একাধিক ছোট দাগ বা আঁচড়ানোর দাগও দেখা যেতে পারে। ক্ষতস্থানে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে অসাড় ও অবশ ভাব শুরু হয়, দেহ টলতে থাকে, চোখের ওপরের পাতা ঢুলে ঢুলে আসে, মণি বড় হয়ে যায়, গলার পেশি অবশ হতে শুরু করে, কথা জড়িয়ে যায়, লালা গড়িয়ে এবং কখনও বমি হয়। রোগী সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে, শ্বাসযন্ত্রের পেশি অবশ হয়ে যায় এবং খিঁচুনি শুরু হয়। ঠিকমতো চিকিৎসা না হলে সাধারণত ৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রোগীর মৃত্যু হয়।

☞চিকিৎসাঃ চিকিত্সককে নিশ্চিত হতে হবে যে ব্যক্তিকে বিষধর সাপে কামড়েছে। এর জন্য মানুষটিকে অন্তত ঘণ্টাখানেক পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। বিষধর সাপে কামড়ালে চামড়ায় অন্তত স্পষ্ট দু’টি দাঁতের দাগ থাকবে এবং ক্ষতস্থানটির স্থানীয় ভাবে কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে। যদি এ সব কিছুই না দেখা যায় এবং মানুষটির কোনও শারীরিক উপসর্গ না দেখা যায় তা হলে ধরে নেওয়া হয় যে এই সাপটি বিষহীন। সাপটিকে ধরতে পারলে এর সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। যদি চিকিৎসক  মনে করেন মানুষটিকে বিষধর সাপে কামড়েছে তা হলে দ্রুত তার চিকিৎসার  ব্যবস্থা করতে হবে।

##এন্টিভেনিন প্রয়োগঃ
সাপের কামড়ের চিকিৎসা করা হয় এন্টিভেনিন ইনজেকশন দিয়ে।এজন্য রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।দায়িত্বরত চিকিৎসককে অবশ্যই কোন সাপে কামড়েছে সে বিষয়ে অবহিত করতে হবে।সুযোগ থাকলে ছবি তুলে রেখে তাকে দেখাতে হবে

☞সাপে কামড়ালে কি করনীয় আর কি নিষিদ্ধঃ

**করণীয়ঃ
প্রথমেই সাপে কামড়ানো রোগীকে আশ্বস্ত করতে হবে যে তার কোনো বিপদ হবে না। উত্তেজনায় রোগীর হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। এতে বিষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রোগীকে এমনভাবে শোয়াতে হবে যেন কামড়ের স্থান হৃদযন্ত্র বরাবর কিছুটা নিচের দিকে থাকে। দেহের আঁটোসাঁটো পোশাক, অলংকার ইত্যাদি খুলে ফেলুন। কামড়ের ওপর দিকে একটি ফিতা বা রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলুন।

বিষক্রিয়ায় রোগীর হৃদস্পন্দন অনেক সময় বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়। সে ক্ষেত্রে সিপিআর দিন। অর্থাৎ, কেউ পানিতে ডুবে গেলে বা অন্য কোনো শকে আক্রান্তকে শুইয়ে বুকে দুই হাত দিয়ে চাপ দিতে থাকুন। এভাবে হার হৃদযন্ত্র সচল করে ফেলুন

যে সাপ কামড়েছে তা দেখতে কেমন তা স্মরণ রাখুন। কেননা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসককে সাপের বর্ণনা জানাতে হয় যাতে নির্ধারণ করা যায় সাপটি বিষাক্ত কিনা। যদি সম্ভব হয় সাপের ছবি তুলে রাখুন। সাপ ধরার চেষ্টা করবেন না।

আহত স্থানকে স্থির রাখুন। রক্ত পড়া অব্যাহত থাকতে দিন। টার্নিকেট (রক্ত পড়া বন্ধ করার ব্যান্ডেজ বা এ জাতীয় কিছু) ব্যবহার করবেন না। ক্ষতস্থানের নড়াচড়া বন্ধ রাখুন। ক্ষতস্থানকে হার্ট লেভেলের নিচে রাখুন। এর ফলে সাপ বিষাক্ত হয়ে থাকলে বিষ ছড়ানো কমে যাবে। ক্ষতস্থানকে হার্ট লেভেলের নিচে রাখার ফলে হার্টের দিকে দূষিত রক্তের প্রবাহ কমবে। 

অ্যালকোহল বা ক্যাফেইন পান করবেন না। এটি আপনার হৃদকম্পনকে বাড়িয়ে দেবে ও বিষকে শরীরে ছড়িয়ে দেবে।

##নির্বিষ সাপের কামড়ের চিকিৎসাঃ

*রক্ত পড়া বন্ধ করুন। নির্বিষ সাপের কামড় জীবননাশের কারণ নয়। কিন্তু ইনফেকশন এড়াতে প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে হবে। বিষহীন সাপের কামড়ের চিকিৎসা পাঙ্কচার ক্ষতের (যেমন- নখে খোঁচা লেগে সৃষ্ট ক্ষত) মতোই করুন। স্টেরাইল গেজ বা ব্যান্ডেজ সহযোগে ক্ষতস্থানে ভালোমতো চাপ প্রয়োগ করুন। এক্ষেত্রে আপনাকে বেশি রক্ত হারাতে হবে না। সাপ নির্বিষ কিনা নিশ্চিত না হয়ে এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা করবেন না। যদি সন্দেহে ভুগেন তাহলে অবিলম্ব চিকিৎসক এর শরণাপন্ন হন।

*সতর্কতার সঙ্গে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করুন। পরিষ্কার পানি ও সাবান দিয়ে কয়েক মিনিট ধরে ধুতে থাকুন। ক্ষতস্থানে বেশি করে পানি ঢালুন। তারপর আবার ধুয়ে নিন। স্টেরাইল গেজ দিয়ে শুকিয়ে নিন। অ্যালকোহল মিশ্রিত প্যাড পাওয়া গেলে ব্যবহার করতে পারেন

*অ্যান্টিবায়োটিক অয়েন্টমেন্ট ও ব্যান্ডেজ দিয়ে ক্ষতস্থানের চিকিৎসা করুন। পরিষ্কৃত ক্ষতস্থানে অ্যান্টিবায়োটিক অয়েন্টমেন্টের প্রলেপ দিয়ে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিন। এর ফলে ইনফেকশনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

** সাপে কামড়ালে যা করবেন নাঃ

সাপ যদি বিষধর হয় তবে কামড়ের স্থান সাবান দিয়ে ধোবেন না। আক্রান্ত স্থানের আশপাশে কেটে রক্ত বের করবেন না। ইলেকট্রিক শক দেবেন না। ঠাণ্ডা পানি বা বরফ কামড়ের স্থানে ধরবেন না।

বড় বিষয়টি হলো, সে সাপ কামড়েছে তাকে ধরে মারার পেছনে সময় নষ্ট করবেন না। আক্রান্তকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ুন। রোগীকে পানি বা কোনো ধরনের পানীয় পান করাবেন না।


বিষধর সাপ সম্পর্কে জানুন। বেশিরভাগ সাপ বিষাক্ত নয়, কিন্তু সব সাপই কামড়াতে পারে। কোবরা, কপারহেড, কোরাল স্নেক, কটনমাউথ, র‍্যাটল স্নেক ইত্যাদি হল পরিচিত বিষাক্ত সাপ। অধিকাংশ বিষাক্ত সাপের মাথা ত্রিকোণাকৃতির। সত্যিকার অর্থে বিষাক্ত সাপ চিনতে মরা সাপের দাঁত ও লালাগ্রন্থি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

ওঝা দিয়ে চিকিৎসা করানোর ফলে বিগত বছরে সাপের কামড়ে অনেকে মারা গিয়েছে।বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা দিয়ে সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীকে বাচানো সম্ভব। তাই সাপে কামড়ালে আতঙ্কিত না হয়ে করণীয় কাজ গুলো পালন করুন এবমগ দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।

ঝালকাঠি আজকাল