শনিবার   ২৪ আগস্ট ২০১৯   ভাদ্র ৯ ১৪২৬   ২২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

ঝালকাঠি আজকাল
৪৬

শোকের মাসে খুনি নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনতে প্রজন্মের প্রতি আহ্বান

প্রকাশিত: ৮ আগস্ট ২০১৯  

 

 
আগস্ট মানে বাঙালির শোকের মাস, বেদনার মাস। বছর ঘুরে আবার এসেছে বাঙালি জাতির ইতিহাসে রক্তের আখরে লেখা শোকাবহ আগস্ট। বিশ্বাস করি শোকের মাসে প্রত্যয় ও শপথে শোককে শক্তিতে পরিণত করার অভয়মন্ত্রে আবার উদ্দীপিত হবে বাঙালি। কারণ বীর বাঙালির ইতিহাসে কলঙ্কিত এক অধ্যায় সূচিত হয়েছে এ মাসেই। ১৯৭৫ সালের এ মাসেই বাঙালি জাতি হারিয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান, বাঙালি জাগরণের মহান জাদুকর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।    

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পলাতক খুনি নূর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে দেয়ার আর্জি জানিয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বরাবর অনলাইন পিটিশনের উদ্বোধন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন গৌরব ৭১ এ উদ্যোগ নিয়েছে। গত ১৭ সেপেটেম্বর, ২০১৮ সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে এক অনুষ্ঠানে এর উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে পিটিশনে সাইন করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি এমপি, মাহবুব আরা গিনি এমপি, সানজিদা খানম এমপি, বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ আহাদ চৌধুরী, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব সাইদুর রহমান প্যাটেল, নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ আরো অনেকে ।

https://www.ipetitions.com/petition/petition-for-deportation-of-killer-nur-chowdhury এই লিঙ্কে অনলাইনে পিটিশন দাখিল করা যাবে। ২০১০ সালে আদালত ১২ জনের ফাঁসির আদেশ দিলেও  বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বাকি খুনিদের একজন বিদেশে মারা গেছে আর ছয়জন খুনি এখনও পলাতক। এদের মধ্যে কানাডায় নূর চৌধুরী এবং যুক্তরাষ্ট্রে রাশেদ চৌধুরীর অবস্থানের বিষয়ে নিশ্চিত সরকার। তাদেরকে ফিরিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও তা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। মৃত্যুদণ্ড বিরোধী কানাডা নূর চৌধুরীকে ফেরাতে চাইছে না তার নীতির কারণে। যদিও কানাডার প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো বলেছেন, তিনি নূর চৌধুরীকে ফেরানোর বিষয়ে একটি উপায় খোঁজার চেষ্টা করছেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ইতিহাসের কালোরাতে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ধানমণ্ডির বাসভবনে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল ও ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেলসহ পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল।

সেদিনের সেই ভয়াল বীভৎস স্মৃতিতে আনলে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট খুনিও বোধ হয় আঁতকে উঠবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাসভবনসহ তিনটি বাড়িতে সংঘটিত খুনিদের নারকীয় পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের ভয়াল বীভৎসতার হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর আলাউদ্দিন আহমেদ পিএসসি।

“ কী বীভৎসতা! রক্ত, মগজ ও হাড়ের গুঁড়ো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল প্রতিটি তলার দেয়াল, জানালার কাঁচ, মেঝে ও ছাদে। রীতিমত রক্তগঙ্গা বইছে যেন ওই বাড়িতে। গুলির আঘাতে দেয়ালগুলোও ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। চারপাশে রক্তের সাগরের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ঘরের জিনিসপত্র। প্রথম তলার সিঁড়ির মাঝখানে নিথর পড়ে আছেন ঘাতকের বুলেটে ঝাঁঝরা হওয়া চেক লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি পরা স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু লাশ হয়ে। তলপেট ও বুক ছিল বুলেটে ঝাঁঝরা। নিথর দেহের পাশেই তাঁর ভাঙা চশমা ও অতিপ্রিয় তামাকের পাইপটি। অভ্যর্থনা কক্ষে শেখ কামাল, টেলিফোন অপারেটর, মূল বেডরুমের সামনে বেগম মুজিব, বেডরুমে সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজি জামাল, নিচতলার সিঁড়িসংলগ্ন বাথরুমে শেখ নাসের এবং মূল বেডরুমে দুই ভাবির ঠিক মাঝখানে বুলেটে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলের লাশ।” এভাবেই ভয়াল ও নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দেন তিনি।
পৃথিবীর এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর অনুজ শেখ নাসের, ভগ্নীপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবি ও সুকান্ত, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা ও সাংবাদিক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি এবং আবদুল নাঈম খান রিন্টু ও কর্নেল জামিলসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন। এ সময় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান।

আমি দুটি মামলার কথা তুলে ধরছি, যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভিনিয়ায় ১৯৮৩ সালে হত্যা মামলায় জোসেফ জন কিনলার নামের এক আসামির মৃত্যুদণ্ড হয়। পরে সে মৃত্যুদণ্ডের ভয়ে পালিয়ে গিয়ে কানাডায় আশ্রয় নেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আবেদনে কানাডা তাকে ফেরত দেয় এবং তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে না এমন কোন শর্ত কানাডা সেই সময় দেয়নি। ঠিক তার পরের বছর ১৯৮৪ সালে একই অবস্থার মুখোমুখি হন চিটারড এইজ নামের যুক্তরাষ্ট্রের আরেক নাগরিক কিন্তু তাকেও ফেরত দেয় কানাডা।

বর্তমান প্রচলিত আইনে কোন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ফেরত দেয় না কানাডা। অনেক আন্তর্জাতিক আইন বিশ্লেষকের মতে এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে, যা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে খুনি নূর চৌধুরীকে বাংলাদেশে ফেরত আনা সম্ভব।

প্রিয় প্রজন্ম, আজ যখন জাতীয় শোকের মাসে মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করছে জাতি তখন সঙ্গত কারণেই নবীন প্রজন্মকেও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই- নিজের জীবনের চেয়েও দেশ আর দেশের মানুষকে যিনি ভালবেসেছিলেন, ফাঁসি নিশ্চিত জেনেও যিনি পাকিস্তানি কারাগারে বসে আপোস করেননি স্বাধীনতার প্রশ্নে, যিনি বারবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বলেছিলেন, এ দেশের স্বাধীনতা আর জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক মুক্তি, এ জাতি তাঁরই উত্তরসূরি। যিনি ১৫ আগস্ট কালরাতে ঘাতকদের মেশিনগানের মুখেও ছিলেন অকুতোভয়, প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?- বাঙালি জাগরণের এই জাদুকরের দৈহিক বিনাশ ঘটলেও তাঁর আদর্শের মৃত্যু হতে পারে না। মানুষ মরে যায়, আদর্শ মরে না। তাই বঙ্গবন্ধু কোন ব্যক্তিমাত্র নন, অবিনশ্বর এক আদর্শ ও প্রেরণার নাম। সেই প্রেরণাতেই এগিয়ে আমরা এগিয়ে যাবো।  

তাই আসুন, ইতিহাসের দায় মুক্তির জন্য আমরা এই পিটিশনে সাইন করে সারা বিশ্বকে জানাতে চাই খুনিরা সেদিন শুধু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করেনি, নির্মমভাবে হত্যা করেছিল নিষ্পাপ শিশু রাসেলকে; হত্যা করেছিল গর্ভবতী মাকে; হত্যা করেছিল নারীকে। তাই বাংলাদেশের অকৃতিম বন্ধু পৃথিবীর অন্যতম মানবিক রাষ্ট্র কানাডা এই জঘন্য খুনির নিরাপদ আবাসভূমি হতে পারে না! ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে দশ হাজারেরও বেশি পিটিশনে সাইন করেছে । আমরা সবাই সোচ্চার হলে সেটি দ্রুত কোটিতে রূপান্তর হতে পারে। আমাদের প্রজন্ম প্রমাণ দিয়েছে ২০১৩ সালে শাহবাগ গণজাগরণ সৃষ্টি করে। আমরা সেদিন জেগে উঠেছিলাম বলেই যুদ্ধাপরাধী কুখ্যাত খুনি কসাই কাদেরের ফাঁসি নিশ্চিত হয়েছিল। তাই আসুন, ইতিহাসের কলঙ্কমোচনের জন্য আরেকবার জেগে উঠি। মাত্র ১০ সেকেন্ড সময় ব্যয় করে পিটিশনে ঢুকে আপনার নাম এবং মেইল এড্রেস লিখে পিটিশন সাইন করি এবং বিশ্ব জনমত গঠন করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের আত্মস্বীকৃত খুনি নূর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের দণ্ড কার্যকরে ভূমিকা রাখি ।

এই বিভাগের আরো খবর