বৃহস্পতিবার   ২৪ অক্টোবর ২০১৯   কার্তিক ৮ ১৪২৬   ২৪ সফর ১৪৪১

ঝালকাঠি আজকাল
১৯

মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হবে বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক বলেছেন, বাংলাদেশ ‘প্যালেরমো প্রটোকল’ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ‘ধারাবাহিক পদক্ষেপ’নেয়া শুরু করা হবে। রোববার (১৫ সেপ্টেম্বর) ‘হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা’য় অনুষ্ঠিত ‘কম্প্রিহেন্সিভ রেস্পন্সেস টু ট্রাফিকিং ইন পারসন্স’ নামের একটি অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘এরই মধ্যে প্যালেরমো প্রটোকল অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। যা হবে আইন প্রয়োগকারী উপকরণ। অনুমোদন পেলেই মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কয়েকটি মন্ত্রণালয় এক জোট হয়ে পদক্ষেপ নেবে।’

বাংলাদেশের মানবপাচার মোকাবিলা করার চ্যালেঞ্জগুলো খু্বই বৈচিত্র্যময়। পাচারকারীরা খুব স্মার্ট এবং এ ব্যবসায় তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের মানুষরাও জড়িত বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র সচিব।

মানবপাচারের ধরন প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে জানিয়ে শহিদুল হক বলেন, ‘আপনি যদি পুরনো কায়দায় মানবপাচার প্রতিরোধ করতে চান তাহলে ব্যর্থ হবেন। বাস্তবতা হলো মানবপাচার প্রতিরোধে উদ্যোগ ও এই ব্যবসার মধ্যে বিস্তর তফাৎ আছে।’

‘আপনি যদি মানবপাচার নিয়ে কথা না বলেন, তাহলে অভিবাসন নিয়ে আসলে আপনি কথা বলতে পারবেন না। আমরা মানবপাচার প্রতিরোধে অনেক উদ্যোগ নিয়েছি। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার মানবপাচার প্রতিরোধে প্যালেরমো প্রটোকল রেটিফাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

‘অবৈধভাবে দেশের বাইরে যাওয়ায় বাংলাদেশের অনেক অভিবাসী মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছেন। চলাচলে সীমাবদ্ধতা, ঋণের চক্রে পড়া, জোরপূর্বক শ্রম, যৌন নির্যাতন, জোরপূর্বক বিবাহ এবং দাসত্বের মতো শোষণমূলক আচরনের শিকার হচ্ছেন অভিবাসীরা। দরিদ্র ও প্রান্তিক নারী ও পুরুষ এবং শিশুরাই মানব পাচারকারীদের লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছেন’-যোগ করেন পররাষ্ট্র সচিব।

জাতিসংঘের মাইগ্রেশন নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বাংলাদেশ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টপেন্টের ব্যুরো অব ইন্টারন্যাশনাল নারকোটিক্স অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট অ্যাফেয়ার্স (আইএনএল)।

মানবপাচার এবং চোরাচালান উভয়ই বৈশ্বিক ঘটনা। এটি বাংলাদেশের জন্য এখন হুমকিস্বরূপ। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ট্রাফিকিং ইন পারসন (টিআইপি) রিপোর্ট ২০১৯ অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য মনুষ অবৈধভাবে দেশের বাইরে যাচ্ছেন। এই অভিবাসীরা পাচারকারীদের শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এ কারণে টিআইপি প্রতিবেদনে টানা তিন বছর বাংলাদেশকে দ্বিতীয় পর্যায়ের ‘ওয়াচ লিস্ট’- এ রাখা হয়েছে। যেখানে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার মানবপাচার নির্মূলে যথাযত উদ্যোগ নিচ্ছে না। মানবপাচার প্রতিরোধে সরকার ও অভিবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সকল পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করার পরামর্শ আসে প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের পলিটিক্যাল/ইকোনোমিক কাউন্সেলর ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘মানবপাচারকে আমরা মারাত্মক অপরাধ হিসেবে দেখছি। সর্বশেষ টিআইপি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ দ্বিতীয় পর্যায়ের লিস্টে আছে, যেটি একটি উদ্বেগের বিষয়। কারণ, পাচারের শিকার অনেক মানুষ এখন ভুক্তভোগী।’

প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য একটি সুপারিশের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘পাচারকারীদের আইনের আওতায় এনে বিচার করার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের গঠনমূলক কর্ম-পরিকল্পনা আছে। এখন এর প্রয়োগের ওপর জোর দিতে হবে।’

BD-2.jpg

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে জাতিসংঘের রেসিডেন্ট কো-অর্ডিনেটর মিয়া সেপ্পো বলেন, ‘সমাজে যারা প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত এবং ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন তারাই বেশি পাচারের শিকার হচ্ছেন। এই সমস্যা সমাধানে সমন্বয়, সক্ষমতা বৃদ্ধি, সম্পদ ও পরিসংখ্যান অনেক জরুরি। তবে এই বিষয়গুলো বাস্তবায়নে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে।’

মানবপাচার প্রতিরোধে সৃজনশীল এবং সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন সেপ্পো। তিনি বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, এটি একটি উন্নয়নমূলক বিষয়। যারা পাচারের শিকার হচ্ছেন বা বেঁচে আসতে পারছেন তাদেরকে অবশ্যই সহযোগিতা করতে হবে।

অনুষ্ঠানের ধারণাপত্রে বলা হয়, পাচারের শিকার মানুষ যৌন শোষণ, জোরপূর্বক শ্রম, বহু ও জোরপূর্বক বিবাহ, শিশু শ্রমিকদের শোষণ, পথশিশুদের পাচার এবং অঙ্গবাণিজ্যের শিকার হচ্ছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অভিবাসী শ্রমিকেরা অনৈতিক নিয়োগের শিকার হচ্ছেন। পাচারকারীরা ভারত, পাকিস্তান ও এশিয়ার মধ্যপূর্বঞ্চলীয় দেশগুলোকে ব্যবহার করে মানুষ নিয়ে যাচ্ছে। এতে মানুষ ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হচ্ছে। যেটি চরম মানবাধিকারের লঙ্ঘন।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা-আইওএম বাংলাদেশের মিশন প্রধান গিওরগি গিগাওরি বলেন, ‘কর্মসংস্থানের অভাব, নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে সচেতনতার অভাব এবং অভিবাসনের জন্য অনেক বেশি খরচের কারণে মানুষ অনিরাপদভাবে দেশের বাইরে যাচ্ছেন। জাতিসংঘের মাইগ্রেশন নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক হিসেবে আমরা অভিবাসীরা যে দেশে থাকছেন, যে দেশ থেকে যাচ্ছেন এবং যে দেশগুলো দিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে তাদের অধিকার ও ভালো থাকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। একই সঙ্গে, মানবপাচার রোধে আমরা সবসময় সরকারের পাশে আছি।’

মানবপাচার রোধে বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ২০১২ সালের মানাবপাচার প্রতিরোধ আইন অন্যতম। ২০১৭ সালের ওই আইনের বিধি করে বাস্তবায়ন করছে সরকার। এ ছাড়া মানবপাচার রোধে সরকার ২০১৮-২০২২ ব্যাপী একটি জাতীয় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘মানবপাচার বিশ্বব্যাপী তৃতীয় বৃহত্তর ব্যবসা। মানবপচার প্রতিরোধে এরই মধ্যে সরকার অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। মানবপাচার বিষয়টি যেভাবে বড় হচ্ছে সেই হারে আমদের মানবসম্পদ নেই। তবে সব পক্ষ একসঙ্গে কাজ করলে আমরা মানবপাচার প্রতিরোধ করতে পারব।’

মানবপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারকে সর্বোত্তমভাবে সহায়তা করতে এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সরকারি সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, দাতাসংস্থা এবং উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে মার্কিন বিচার বিভাগের আবাসিক আইনজীবি এরিক ওপেঙ্গা, আইএনসিআইডিআইএনর নির্বাহী পরিচালক এ কে এম মাসুদ আলী এবং আইওএমর সিনিয়র মাইগ্র্যান্ট প্রোটেকশন স্পেশালিস্ট জনাথন মার্টেন্সও কথা বলেন।

এই বিভাগের আরো খবর