বৃহস্পতিবার   ২১ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৬ ১৪২৬   ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

ঝালকাঠি আজকাল
৫৮৭

নেফ্রটিক সিনড্রোমের চিকিৎসা

প্রকাশিত: ২২ মার্চ ২০১৯  

কিডনির একটি রোগ হচ্ছে নেফ্রোটিক সিনড্রোম।এটি কিডনির এমন এক ধরনের রোগ, যেখানে প্রসাবের সাথে অনেক পরিমানে প্রোটিন বেরিয়ে যায়।

নেফ্রোটিক সিনড্রোম সাধারণত দুই থেকে ছয় বছরের বাচ্চাদের হয়ে থাকে। নেফ্রেটিক সিনড্রোমে প্রস্রাব দিয়ে এলবুমিন প্রোটিন বের হয়ে যায়। স্বাভাবিক ও সুস্থ অবস্থায় প্রস্রাবে কোন এলবুমিন থাকেনা বা থাকলেও খুব সামান্য পরিমাণ থাকে। প্রস্রাব দিয়ে বেশি প্রোটিন বের হলে রক্তে প্রোটিন কমে যায়। তখন শরীরে পানি জমে শরীর  ফুলতে থাকে। প্রথমে মুখ ফোলে। তারপর সারা শরীর। এ অবস্থায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় ও  বারবার রোগ সংক্রমণ হয়। রক্তে কোলেস্টরল বেড়ে যায়। প্রসাবের পরিমাণ কমে যায়। পেটে ব্যথা অনুভূত হয়। বাচ্চার অনেক সময় জ্বর হয়। কফ, কাশি হয়। শ্বাসকষ্ট হতে পারে। কারণ নেফ্রোটিক সিনড্রমের কারণে ফুসফুসের পর্দায় পানি জমে যায়।  সাধারনত এই রোগ কিডনির ছোট ছোট রক্তনালী যা শরীর থেকে দূষিত  পদার্থ বের করে দেয়, সেগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত হবার  কারনে হয়ে থাকে ।

নেফ্রোটিক সিনড্রোম রোগের কারন:

নেফ্রোটিক সিনড্রোম প্রাইমারী এবং সেকেন্ডারী হতে পারে। বাচ্চাদের নেফ্রোটিক সিনড্রোমের প্রধান কাণ ‘মিনিমাল চেঞ্জ ডিজিজ’ আর বড়দের  মূল কারণ মেমব্রেনাস গ্লমেরুলো নেফ্রাইটিস। সেকেন্ডারী যেসব কারণে নেফ্রোটিক সিনড্রোম হতে পারে তার মধ্যে আছে- ডায়াবেটিস, হেপাটাইটিস, ম্যালেরিয়া, এইডস, সিফিলিস, সারকয়ডোসিস, মাল্টিপল মায়োলোমা, ভাস্কুলাইটিস, ক্যান্সার, কিছু ওষুধ যেমন-গোল্ড, পেনিসিলিন, ক্যাপটোপ্রিল, জগরেন’স সিনড্রোম, এসএলই ইত্যাদি।

বাচ্চাদের নেফ্রোটিক সিনড্রোমে ৯০ শতাংশের কোনো কারণ জানা যায় না। ১০ ভাগ হলো সেকেন্ডারি। মানে কোনো কারণের জন্য। কোনো সংক্রমণ থেকে নেফ্রোটিক সিনড্রোম দেখা দিতে পারে। যেমন : ম্যালেরিয়ার কারণে নেফ্রোটিক সিনড্রোম হতে পারে। সিফিলিসের কারণে হতে পারে। বাচ্চার যদি লিম্ফোমা, লিউকোমিয়া হয় -এসব কারণে এই সিনড্রোম দেখা দিতে পারে।

বিভিন্ন ওষুধের কারণে হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খাওয়ার জন্য নেফ্রোটিক সিনড্রোম হতে পারে। এমনকি পোকা, সাপ বা মৌমাছি কামড় দিলেও নেফ্রোটিক সিনড্রোম হতে পারে। তবে বাচ্চাদের ৯০ শতাংশ নেফ্রোটিক সিনড্রোম কোনো কারণ ছাড়াই হয়ে থাকে।

আর এইসব  কারনের ফলে কিডনির গ্লোমেরিলাই নামক ছোট ছোট রক্ত নালী রয়েছে। যারা ছাঁকন পদ্ধতিতে শরীরের থেকে অপ্রয়োজনীয় পদার্থ বের করে দেয় ও দরকারি পদার্থ পুনরায় ব্যবহার এর জন্যে রেখে দেয়। কিন্তু এই সব রক্ত নালি ক্ষতি গ্রস্থ হবার কারণে এলবুমিন নামক প্রোটিন ধরে রকাহতে পারে না, বেশি বেশি প্রোটিন চলে যায়, এবং যার ফলশ্রতিতে নেফ্রোটিক সিনড্রোম সৃষ্টি হয় ।

নেফ্রোটিক সিনড্রোম এর লক্ষন ও উপসর্গঃ

– চোখ মুখ ফুলে যাওয়া
– সারা শরীরে পানি জমা
– প্রসাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
– বেশি বেশি পানি ধরে রাখার কারণে ওজন বেড়ে যাওয়া

– শরীরের যে সকল স্থানে চাপ পড়ে সে সকল স্থানে রসস্ফীতি বা ইডিমা। 
– প্রজনন অঙ্গ স্ফীতি

– উদর গহ্বরে পানি জমা

–সারাদেহে রস সঞ্চয় বা অ্যানাসার্কা

– শ্বাসকষ্ট

– মূত্র ফেনা ফেনা হওয়া

যেসব  কারণে নেফ্রোটিক সিনড্রোম হতে পারেঃ


★ মিনিমাল চেঞ্জ ডিজিজ
★ ডায়াবেটিস জনিত কিডনির রোগ
★ হার্ট ফেইলিওর
★ এমাইলয়েডসিস 

★কিডনির শিরায় রক্ত জমাট বাধলে

নেফ্রোটিক সিনড্রোম এর ঝুকিসমুহঃ
১। উপরে উল্লেখিত অসুখ রয়েছে যাদের।
২। কিছু মেডিসিনের পার্শপ্রতিক্রিয়া, যেমনঃ কিছু কিছু ব্যথার মেডিসিন।
৩। কিছু ইনফেকশন যেমনঃ হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, ম্যালেরিয়া, এইচআইভি ইত্যাদি।

নেফ্রোটিক সিনড্রোম  থেকে সৃষ্ট জটিলতাঃ
– রক্তলানীর ভেতর রক্ত জমাট বেধে যাওয়া
– উচ্চ রক্তচাপ
– রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া
– একিউট কিডনি ফেইলিওর
– ক্রনিক কিডনি ফেইলিওর
– ইনফেকশন / সংক্রমন

– রক্তরসে ইমিউনোগ্লোবিন 'জি' কমে যাওয়া

– স্ট্রেপ্টোকক্কাল ইনফেকশন

–স্বত: ব্যবক্টোরিয়াল পেরিটোনাইটিস

– সেলুলাইটিস

– থ্রম্বোএমবোলিজম বা অনুচক্রিকার দলা পাকানো

 


রোগ নির্নয়ঃ
– ইউরিন টেস্টঃ প্রসাবে অনেক বেশি পরিমান প্রোটিন থাকবে
– ব্লাড টেস্টঃ এলবুমিন নামক প্রোটিনের পরিমান কম থাকে ,কোলেস্টেরল এর পরিমান বেশি
– কিডনি বায়োপসি

নেফ্রোটিক সিন্ড্রোম এর চিকিৎসা ঃ

১) প্রথম দু-এক সপ্তাহ পূর্ণ বিশ্রাম। স্বাভাবিক খাবার খাবে। তবে খাবারে অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার দেয়া যাবেনা।

২) যেকোনো জটিলতা যেমন পেটে বেশি পানি জমলে তা বের করা বা বুকে পানি জমলে তার জন্য ইনজেকশন দিতে হবে।

৩) কোনো সংক্রমণ থাকলে তার চিকিৎসা করাতে হবে।

৪) শিশুদের নেফ্রোটিক সিনড্রোমের চিকিৎসায় স্টেরয়েড খুব কার্যকর ওষুধ, তবে তা অবশ্যই সঠিক ডোজ ও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়। অবশ্যই শিশুবিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

তবে নেফ্রোটিক সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশুরোগীদের প্রায় ৯৩ শতাংশ পুরোপুরি সেরে যায়। কিন্তু চিকিৎসার পরও ঘন ঘন শরীর ফোলা দেখা যেতে পারে। পরে ১৪-১৫ বছরের মধ্যে অনেকাংশেই ঠিক হয়ে যায়।