বুধবার   ২০ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৫ ১৪২৬   ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

ঝালকাঠি আজকাল
৬১

নবী কারিম (সা.) এর ওপর ওহি নাজিলের পদ্ধতি

প্রকাশিত: ৪ নভেম্বর ২০১৯  

কোরআনুল কারিম হুজুর (সা.) এর নিকট ওহির মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়। এজন্য ওহি সম্পর্কে কয়েকটি কথা জেনে রাখা দরকার। 

প্রথমত মানুষকে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছেন এবং তার ওপর কিছু গুরু দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। বাকি সব মাখলুককে মানুষের খেদমতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। 

এই জন্য মানুষকে দুনিয়াতে আসার পর দু’টি কাজের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। (এক) মানুষ এ দুনিয়ার সৃষ্ট বস্তু থেকে সঠিক কাজ আদায় করে নিবে। (দুই) এই দুনিয়ার সৃষ্ট বস্তুকে ব্যবহার করতে গিয়ে আল্লাহর বিধানের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। এমন কোনো কাজ করা যাবে না যা আল্লাহ তায়ালার অসন্তুষ্টির কারণ হয়।
 
আর এ দু’টি কাজ করার জন্য এলেমের প্রয়োজন। কারণ মানুষ যতক্ষন পর্যন্ত একথা জানতে না পারবে যে, এ দুনিয়ার হাকিকত কী এবং তা হতে কী ধরণের ফায়দা নেয়া যায়, ততক্ষন পর্যন্ত সে দুনিয়ার কোনো বস্তুকে নিজের লাভের জন্য ব্যবহার করতে পারবে না। তাছাড়া যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ আল্লাহর পছন্দনীয় কাজ কোনটি এবং অপছন্দনীয় কাজ কোনটি এই ব্যাপারে জানতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী জীবন যাপন করাও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করার সঙ্গে সঙ্গে এমন তিনটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন। যদ্বারা মানুষ উপরোল্লিখিত বিষয়গুলোর জ্ঞান অর্জন করতে পারে।

(১) حواس الخمسة তার পঞ্চ ইন্দ্রিয়। যেমন নাক, কান, চোখ, জিহ্বা, হাত-পা।

(২) عقل আকল বা বিবেক। 

(তিন) ওহি। 

অনেক বিষয়ের এলেম মানুষ حواس الخمسة পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অর্জন করতে পারে। আবার অনেক জিনিসের এলেম মানুষ আকল বা বিবেক দ্বারা অর্জন করতে পারে। পঞ্চ ইন্দ্রিয় ও আকল দ্বারা যে সমস্ত জিনিসের এলেম অর্জন করা যায় না ওহির মাধ্যমে সে সমস্ত বিষয় অর্জন করা যায়। অতএব, এ আলোচনা দ্বারা বুঝা গেল, এলেম অর্জনের ক্ষেত্রে ওহিই হলো সর্ব উত্তম মাধ্যম।

লওহে মাহফুজ থেকে হুজুর (সা.) এর ওপর ওহি অবতীর্ণ হওয়ার পদ্ধতি:
লওহে মাহফুজ থেকে হুজুর (সা.) এর ওপর ওহি কীভাবে অবতীর্ণ হতো এ ব্যাপারে ৪টি মতামত রয়েছে-

(১) প্রথম মতটি অন্যান্য মতের তুলনায় বেশি প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ। মতটি হলো যে, এই সম্পূর্ণ কোরআনে কারিম একবারে লওহে মাহফুজ থেকে কদরের রজনীতে বাইতুল ইজ্জত নামক ঘরে নাজিল হয়। বাইতুল ইজ্জত হলো প্রথম আকাশের একটি ঘরের নাম। তারপর সেখান থেকে হজরত জিব্রাইল (আ.) প্রয়োজন অনুসারে অল্প অল্প নিয়ে অবতীর্ণ হতেন এবং এই অবতরণের ধারাবাহিকতা ২৩ বছর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

(২) লওহে মাহফুজ থেকে কোরআনে কারিম ৬০ কিংবা ৬৩ বছরের মধ্যে এভাবে নাজিল হয় যে, কদরের রজনীতে কোরআনে কারিমের ওই পরিমাণ অংশ প্রথম আসমানে নিয়ে আসা হতো যে পরিমাণ অংশ এক বছরের মধ্যে হুজুর (সা.) এর ওপর অবতীর্ণ করা হবে।

(৩) সম্পূর্ণ কোরআনে মাজিদ একত্রে লওহে মাহফুজ থেকে অবতীর্ণ হয়। তা এভাবে যে, পুরো কোরআনে কারিম একত্রে কোরআনের রক্ষণাবেক্ষনকারী ফেরেশতাদের হাতে অর্পণ করা হয়। তারপর তারা প্রয়োজন অনুসারে অল্প অল্প করে হজরত জিব্রাইল আমীনের হাতে অর্পন করেন। যা নিয়ে হজরত জিব্রাইল (আ.) দুনিয়াতে প্রেরণ করে।

(৪) ৬০ কিংবা ৬৩ বছরের মধ্যে কোরআনে কারিম সরাসরি লওহে মাহফুজ থেকে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু অবতরণের সূচনা কদরের রজনীতে হয়।

ওহির প্রকার: 
ওহি পাচঁ পদ্ধতিতে হুজুর (সা.) এর উপর অবতীর্ণ হত :
(১) ঘণ্টার আওয়াজের মতো গুনগুন শব্দ করে। এই প্রকারের ওহি হুজুর (সা.) এর জন্য খুবই কঠিন ছিল।

(২) হজরত জিব্রাইল (আ.) মানুষের মতো রূপ ধারণ করে হুজুর (সা.) এর নিকট আসতেন। এই প্রকারের ওহি হুজুর (সা.) এরা জন্য সবচেয়ে সহজ ছিল। (হজরত জিব্রাইল (আ.) বেশির ভাগ হুজুর (সা.) এর সাহাবী দেহইয়া কালবীর রূপ ধারণ করতেন।)

(৩) হজরত জিব্রাইল (আ.) নিজ আকৃতিতে হুজুর (সা.) এর নিকট চলে আসতেন। এই প্রকারের ওহি হুজুর (সা.) এর জীবনে তিনবার এসেছে। (হুজুর (সা.) এর চাচা হজরত হামজা (রা.) হজরত জিব্রাইল (আ.)-কে নিজ আকৃতিতে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেন।)

(৪) স্বয়ং আলাহপাক কোনো কিছুর মাধ্যম ছাড়া সরাসরি হুজুর (সা.) এর সঙ্গে কথা বলতেন। এই প্রকারের ওহি হুজুরের জীবনে জাগ্রত অবস্থায় শবে মেরাজে ঘটেছে। অবশ্য স্বপ্নের মধ্যে হুজুর (সা.) আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছেন।

(৫) হজরত জিব্রাইল (আ.) অদৃশ্য থেকে হুজুর (সা.) এর হৃদয়ে ওহি ঢেলে দিতেন। তাছাড়াও আরেরা অন্য প্রকার ওহির আলোচনা বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত রয়েছে। বিস্তারিত জানার জন্য বুখারী শরীফ এবং উলূমুল কোরআন বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।

ওহি লেখকদের নাম:
হুজুর (সা.) এর ওহি লেখার কাজ যারা আঞ্জাম দিয়েছেন তাদের সংখ্যা কোনো কোনো মুফাসসিরীন চল্লিশ পর্যন্ত উল্লেখ করেছেন। তম্মধ্যে প্রসিদ্ধ কয়েকজন হজরত আবু বকর সিদ্দিক, হজরত ওমর, হজরত ওসমান, হজরত আলী, হজরত যোবায়ের, হজরত আমের ইবনে ফোহাইরা, আমর ইবনে আস, উবাই ইবনে কাব, আব্দুলাহ ইবনে আরকাম, সাবেত ইবনে কায়েস, হানজালা বিন রবী, মুগিরা ইবনে শুবা, আব্দুলাহ ইবনে রাওয়াহা, খালেদ ইবনে ওয়ালিদ, সাইদ ইবনে আস, মুআবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান, যায়েদ ইবনে সাবেত, তালহা ইবনে উবাইদিল্লাহ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, মুআইকিব দাউসী, হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান ও হুয়াইতিব ইবনে আবদিল ওজ্জা রাজিয়ালাহু তায়ালা আনহুম আজমাইন।

এই বিভাগের আরো খবর