শনিবার   ২৩ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৮ ১৪২৬   ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

ঝালকাঠি আজকাল
৯৬২

জ্বর-ঠোসার কারণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ

প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

অনেক সময় ঘুম থেকে জেগেই মনে হয় রাতে হয়তো জ্বর এসেছিলো এবং ঠোটের কোণে বা ভিতরের দিকে যন্ত্রণাদায়ক ফুসকুড়ি দেখা দেয়। সাধারণভাবে আমরা একে বলে থাকি জ্বরঠোস, জ্বর-ঠোসা বা জ্বরঠুঁটো। এটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ফিভার ব্লিস্টার বলেন। এটি প্রকাশ পাবার ২-৩ দিনের মধ্যে ব্লিস্টারে ব্যথা অনুভব হলে তখন একে বলা হয় কোল্ড সোর। 
চলুন এই  কোল্ড সোর বা জ্বর-ঠোসার সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেই-

জ্বর-ঠোসার  লক্ষণ :

১. ঠোঁটে টনটনে ব্যথা হওয়া, কিংবা ক্ষোঁচা বোধ হওয়া, এবং চুলকানি অনুভব করা (প্রায়ই জ্বরঠোসা হওয়ার আগ আগ দিয়ে এই লক্ষণগুলো দেখা যায়)।
২. লাল কিংবা তরলে পূর্ণ ফুস্কুরির মতো, বেদনাদায়ক ফোস্কা ওঠা। সাধারণত ঠোঁটের চারপাশে বা মুখে এগুলো উঠে থাকে।
৩. জ্বরঠোসা ওঠার প্রথম দিকে জ্বর আসা এবং কণ্ঠনালীর ফুলে ওঠা; তবে পরবর্তী পর্যায়ে এই লক্ষণগুলো আর থাকে না।
৪. কখনও কখনও  বমিভাব কিংবা বমি হতে পারে।
৫. কোন কিছু খেতে, কথা বলতে কিংবা গিলতে অসুবিধা হতে পারে। এছাড়া মাথাব্যথাও হতে পারে।

জ্বর-ঠোসা কেন হয়?

আমরা সাধারণভাবে আমাদের ঠোঁটে ফুসকুড়ি উঠাকে মনে করি জ্বর আসার লক্ষণ হিসেবে। তবে আমদের এই ধারণা পুরোপুরি  ঠিক নয়।  জ্বর-ঠোসাকে ফিভার ব্লিস্টারও বলা হয়। এ রোগের প্রধান কারণ হলো HSV-1 (Harpes simplex virus-1) এর ইনফেকশন।  আমাদের শরীরে  এই ভাইরাসের  ইনফেকশনের  কারণেই  মুলত জ্বর আসে। তবে জ্বরের কারণে কিংবা অন্যকোন ইনফেকশনের কারণে যদি আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায় তাহলেও জ্বর-ঠোসা হতে পারে।  

জ্বর-ঠোসা যাদের বেশি য়:

গবেষণার মাধ্যমে দেখা গেছে যে শতকরা প্রায় ৮০ভাগ মানুষের HSV-1 এ আক্রান্ত হয়ে থাকেন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই জীবাণু সুপ্ত অবস্থায় থাকে। কারও কারও ক্ষেত্রে দশ বছর বয়সে বা তারও পড়ে এর  প্রথম প্রকাশ ঘটে। এমনকি ফিভার ব্লিস্টার একবার সেরে গেলেও স্নায়ুকোষে HSV-1 ভাইরাস লুকিয়ে থাকার দরুন একজনের জীবনে বারবার এর প্রকাশ ঘটতে পারে। ফিভার ব্লিস্টার পুনরায় প্রকাশিত হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত কারণগুলো সাধারণত দায়ী।

যাদের দেহে পূর্ববর্তী কোন ইনফেকশন হয়েছিল। যারা অতিরিক্ত মানসিক চাপে থাকেন। মহিলাদের মাসিক হওয়ার সময়। যাদের শরীরে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাব বেশী পড়ে। কোন আঘাতজনিত কারও শরীরে ক্ষত হওয়া ইত্যাদি। 

যেভাবে  জ্বর-ঠোসা ছড়াতে পারে:

HSV-1 ভাইরাস এ আক্রান্ত হতে পারে যে কেউ। কোন আক্রান্ত ব্যক্তির ঠোঁটের ব্লিস্টারের ভেতরে তরল বা লালা শেয়ার করার মাধ্যমে মুলত HSV-1 ইনফেকশন ছড়ায়। তবে নিম্নের কারণ বা মাধ্যমে এর সংক্রমণ সাধারনত দ্রুত হয়ে থাকে-

১. আঙুলের মাধ্যমে ব্লিস্টার স্পর্শকরে ঐ হাত দিয়ে শরীরের সৃষ্ট অন্য কোন ক্ষতস্থান স্পর্শ করলে। 
২. যদি ব্লিস্টার ভেঙে যাওয়ার কারণে ব্লিস্টারে থাকা তরল আশেপাশের জায়গায় ছড়িয়ে পড়লে।
৩. আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যাবহার করা পানির গ্লাস বা চামচ শেয়ার করার মাধ্যমে।
৪. আক্রান্ত ব্যক্তির লিপস্টিক, লিপ-বাম বা অন্যান্য কসমেটিক্সে ইত্যাদি শেয়ার করার মাধ্যমে।
৫. রোগীর পরীক্ষা সময় যদি স্বাস্থ্যসেবা দানকারী ডাক্তার কিংবা নার্স গ্লোভস ব্যবহার না করেন তাহলেও  তাদের মাধ্যমে অন্যদের এরোগ ছড়াতে পারে।
৫. চুম্বন করার মাধ্যমে।আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে ওরাল সেক্স করলেও এরোগ ছড়াতে পারে।

জ্বর-ঠোসার চিকিৎসা:

বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই খালি চোখে দেখেই ফিভার ব্লিস্টার সনাক্ত করা যায়। তবে ব্লিস্টারের ভিতর থেকে তরল সংগ্রহ করে  ডিরেক্ট ইমিউনোফ্লুরোসেন্স টেস্ট বা পলিমারেজ চেইন রিএ্যাকশন (পি সি আর) এর মাধ্যমে ভাইরাস সনাক্ত করা যেতে পারে। জ্বর-ঠোসার উপসর্গ সাধারণত ৭ থেকে ১৪ দিন বর্তমান থাকলেও বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এ রোগ এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। তবে  ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে প্রথম সপ্তাহে অ্যান্টি-ভাইরাল জেল  লাগালে আরোগ্যে দ্রুত হয়ে থাকে। কিন্তু ১৪ দিনের বেশি সময় ধরে ব্যথাযুক্ত ফিভার ব্লিস্টার থেকে গেলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরী।  

জ্বর-ঠোসার প্রতিরোধ:

কেউ বছরে মাত্র দুইবার আক্রান্ত হলেও অনেকে আবার প্রায় প্রতিমাসেই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাই নিম্নের কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে এ রোগের সংক্রমণের মাত্রা অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব-

১. ব্যবহৃত পানির গ্লাস, চামচ, লিপস্টিকসহ অন্যান্য কসমেটিক্স কারো শেয়ার না করা। 
২. ছোটদের চুমু না দেয়া।
৩. ব্লিস্টার স্পর্শ করলে ভালো করে হাত ধুয়ে ফেলা।
৪. মানসিক চাপ মুক্ত থাকা।
৫. চুম্বন এবং ওরাল সেক্স থেকে বিরত থাকা।
৬. সানস্ক্রিন ক্রিম, লিপ-বাম ব্যবহার করা।
৭. পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহন করা।
৮. আক্রান্ত ব্যক্তির রুমাল, টিস্যু বা তোয়ালে অন্যদের ব্যবহার করা যাবেনা।

 প্রাকৃতিকভাবে জ্বর ঠোসা সারানোর উপায়:

১. মধু: 
মধুর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে জীবাণুনাশক উপাদান রয়েছে, যা আমাদের মুখের ভেতরের অংশকে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে এবং নতুন কোষ গঠনে বিশেষ ভূমিকা নেয়। তাই তো মধু এবং আমলকী গুঁড়ো একসঙ্গে মিশিয়ে জ্বর ঠোসার ওপর লাগালে দারুন উপকার মেলে। প্রসঙ্গত, হলুদ গুঁড়োর সঙ্গে মধু মিশিয়ে লাগালেও একই উপকার মেলে।

২. ত্রিফলা: 
ত্রিফলা আয়ুর্বেদ চিকিৎসাশাস্ত্রেখুবই পরিচিত একটি নাম। অর্ধেক চা চামচ ত্রিফলা, এক কাপ জলে মিশিয়ে নিতে হবে। তারপর সেই মিশ্রন দিয়ে ভাল করে মুখের ভিতর ধুয়ে নিতে হবে। চেষ্টা করবেন, যাতে এই মিশ্রণটি মুখের ভিতর ১ থেকে ২ মিনিট অবধি থাকে। এরপর জলটা ফেলে দেবেন। এমনটা করলে জ্বরঠোসা সেরে যাবে।

৩. অ্যালোভেরা: 
জ্বর ঠোসার ওপর কিছুটা পরিমাণ অ্যালো ভেরার রস লাগিয়ে রেখে দিন। এমনটা করলে তাড়াতাড়ি উপকার পাওয়া যায়। কারণ অ্যালো ভেরার মধ্যে প্রদাহ জনিত সমস্যা দূর করার ক্ষমতা রয়েছে। এছাড়াও পেটের ঘা দূর করতেও এটি দারুণ কাজ দেয়। এমনকি গ্যাস অম্বলের সমস্যাও দূর করে।

৪.তুলসি পাতা: 
তুলসি পাতা কতটা উপকারি, তা তো আমরা সবাই জানি। এছাড়াও তুলসি পাতা ম্যাজিকের মতো কাজ করে জ্বর ঠোসা সারিয়ে তুলতে। জ্বর ঠোসা হলে সতেজ নিমপাতা চিবিয়ে তারপর জল খেলে উপকার পাওয়া যায়। এছাড়াও মেথি পাতা ভিজিয়ে সেই জল দিয়ে দিনে দু-তিনবার মুখ ধুলেও সমান উপকার মেলে।

 

জ্বর-ঠোসার সমস্যাটা জটিল না হলেও বেশ পীড়াদায়ক। যে কোনো সংক্রমণই ব্যক্তিগত প্রতিরোধের মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব। সবাইকে মনে রাখতে হবে যে কখনও নখ দিয়ে জ্বর-ঠোসা খুটানো যাবেনা এতে হাতের মাধ্যমে ভাইরাস চোখসহ শরীরের অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে  পড়তে পারে।