রোববার   ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯   ভাদ্র ৩১ ১৪২৬   ১৫ মুহররম ১৪৪১

ঝালকাঠি আজকাল
১৫০

গাউট বা গাটের ব্যাথা; যে সব খাবার বর্জন করবেন ও খাবেন

প্রকাশিত: ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮  

রক্তে ইউরিক এসিডের  মাত্রা বেড়ে গেলে বাত বা গাঊট (Gout) হয়। কিছু কিছু অসুধ সেবনে রক্তে uric acid এর মাত্রা বেড়ে যেতে পারে যেমন থায়াজাইড, এসপিরিন, পাইরাজিনামাইড ইত্যাদি। তেমনি রেনাল ফেইলুর, হাইপার প্যারাথাইরয়েডিজম এমন কিছু রোগেও ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে বাত হতে পারে।

শতকরা ৭০ ভাগ বাতের ব্যথাই শুরু হয় পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে। এথেকে গোড়ালি, হাটু, হাত ও পায়ের ছোট জয়েন্ট, কবজি, কনুই ক্রমান্বয়ে এরোগে আক্রান্ত হতে পারে। আক্রান্ত অস্থিসন্ধিটি ফুলে কিছুটা লালচে বর্ণ ধারণ করে এবং ব্যথা করে। অনেক সময় খুধামন্দা এবং জ্বরও এর সহচর হিসেবে দেখা দেয়।

বাত রোগে রক্তে ইউরিক এসিড এর মাত্রার সাথে সাথে ই,এস,আর এবং শ্বেতকনিকার সংখাও বৃদ্ধি পায়। এক্সরে করলে হাড়ে পরিবর্তন ধরা পড়ে। অস্থিসন্ধি থেকে সাইনোভিয়াল ফ্লুইড বা অস্থিরস পরীক্ষা করেও এই রোগ নিশ্চিত হওয়া যায়।

আধুনিক শহুরে জীবনে ইউরিক এসিড বৃদ্ধির সমস্যা অনেকেরই দেখা যায়। এর ফলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে। একটু সচেতন হয়ে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনলে ইউরিক এসিড অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। আসুন জেনে নেওয়া যাক শরীরে ইউরিক এসিড বৃদ্ধিতে কী ধরনের খাবার গ্রহণ করতে হবে। 

আমাদের শরীরে দুই ধরনের এমাইনো এসিডের প্রয়োজন পড়ে। একটি আবশ্যক (এসেনশিয়াল) এমাইনো এসিড। আরেকটি অনাবশ্যক (নন এসেনসিয়াল) এমাইনো এসিড। এই নন এসেনসিয়াল এমাইনো এসিডের মধ্যে একটি হলো পিউরিন। এই পিউরিন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে পাওয়া যায়। কারণ শরীরে পিউরিন তৈরি হয়।

এ ছাড়া কিছু কিছু খাবার থেকেও আমরা পিউরিন নামক এমাইনো এসিড পেয়ে থাকি। কোষে থাকা এই পিউরিনের ভাঙনের ফলে ইউরিক এসিড তৈরি হয়। এই ইউরিক এসিড রক্তে চলে যায়।

আমরা যদি দেহের চাহিদার থেকে বেশি পরিমাণে প্রোটিন খেয়ে থাকি বা খাবারে যদি এলকোহল জাতীয় খাবারের পরিমাণ বেশি থাকে, তা থেকে দেহে পিউরিন নামক নন এসেনসিয়াল এমাইনো এসিড তৈরি হয়। এই পিউরিনের শেষ উৎপাদন হিসেবে ইউরিক এসিড তৈরি হয়।

এই ইউরিক এসিড প্রথমে রক্তে চলে যায়। সেখান থেকে কিডনির মাধ্যমে প্রস্রাবের সঙ্গে দেহ থেকে বের হয়ে যায়। রক্তে যদি ইউরিক এসিডের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পায় এই অবস্থাকে বলা হয় হাইপারইউরিসেমিয়া। এই অতিরিক্ত ইউরিক এসিড সূক্ষ্ম স্ফটিক (ক্রিস্টাল) আকারে জয়েন্টের মধ্যে বিশেষ করে পায়ের আঙ্গুলে ব্যথা সৃষ্টি করে। এ ছাড়া আমাদের দেহের শ্বেত কণিকা এই ইউরিক এসিড স্ফটিককে  ফরেন বডি মনে করে আক্রমণ করে। ফলে বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা হয় বা ফুলে যায়।

প্রথম অবস্থায় শুধু পায়ে ব্যথা হয়। আস্তে আস্তে এর তীব্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পা ফোলা, হাঁটু ও হাঁটুর জয়েন্টে ব্যথা হয়। ফলে ইউরিক এসিড আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁটতেও সমস্যা হয়। হাইপারইউরিসেমিয়ার কারণে শরীরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে। যেমন : বাত, কিডনিতে পাথর, কিডনি অর্কাযকর হওয়া, উচ্চরক্তচাপসহ নানা ধরনের রোগ হতে পারে।

♦ হাইপারইউরিসেমিয়ায় অর্থাৎ গাটের ব্যাথা থেকে মুক্তি পেতে যেসব খাবার পরিহার করতে হবে 

•    অধিক চর্বিযুক্ত মাংস খাওয়া যাবে না। যেমন : গরুর মাংস খাসির মাংস, ভেড়ার মাংস, মহিষের মাংস ইত্যাদি।

•    অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জাতীয় মাংস (অর্গান মিট) খাওয়া যাবে না। যেমন : লিভার, কলিজা, মগজ, জিহ্বা ইত্যাদি। 

•    খোসাযুক্ত প্রাণী পরিহার করতে হবে। যেমন : চিংড়ি মাছ, শামুক, কাকড়া। এ ছাড়া সামুদ্রিক মাছ, ডিমের কুসুম এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।

•    সব রকমের ডাল, বাদাম, মটরশুটি, সিমের বিচি, কাঁঠালের বিচি ইত্যাদি পরিহার করতে হবে।

•    কিছু কিছু শাকসবজি খাওয়া যাবে না। যেমন : পালং শাক,পুঁই শাক, ফুল কপি ব্রকোলি, মিষ্টি কুমড়া, ঢেঁড়শ , পাকা টমেটো ইত্যাদি। এছাড়া মাশরুমও খাওয়া যাবে না। 

•    এলকোহোল, ক্যাফেন জাতীয় বেভারেজ খাওয়া যাবে না। যেমন : চা, কফি, কোমল পানীয়, কারো ক্ষেত্রে চকোলেট খাওয়া যাবে না। 

•    মিষ্টি ফলে ফ্রুকটোস থাকে যা ইউরিক এসিড স্ফটিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্ফটিককে বড় করে দেয়। তাই মিষ্টি ফল পরিহার করাই ভালো।

♦ যেসব খাবারে বাধা নেই

•    চর্বিহীন মাংস খেতে হবে। যেমন : মুরগির মাংস। মাছ, কুসুম ছাড়া ডিম পরিমাণ মতো খাওয়া যাবে।

•    অধিক আঁশযুক্ত খাবার খেতে হবে। যেমন : সবজি-শাক ইত্যাদি। এই আঁশ স্ফটিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শরীর থেকে মল আকারে বের হয়ে যায়।

•    এন্টি অক্সিডেন্ট জাতীয় খাবার খেতে হবে। যেমন : লেবু চা, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল (পেয়ারা, আমলকি, কমলা, মাল্টা), গ্রিন-টি ইত্যাদি খেতে হবে। 

•    এই সময় চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণ পানি পান করতে হবে। প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন লিটার পানি পান করতে হবে।

♦ কারা হাইপারইউরিসেমিয়ায় অর্থাৎ গাটের ব্যাথায় বেশি  আক্রান্ত হন :

•    যাদের বংশে বাতের সমস্যা আছে তারা এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

•    যারা এলকোহল গ্রহণ করে।

•    যারা প্রোটিন জাতীয় খাবার চাহিদার তুলনায় বেশি খেয়ে থাকে এবং শাক সবজি কম খায়।

•    কিছু কিছু ওষুধ রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। যেমন : ডাই ইউরেটিক মেডিসিন।

•    যাদের উচ্চ রক্তচাপ ডায়াবেটিস, কিডনির সমস্যা, হৃদরোগের সমস্যা আছে তাদের ইউরিক এসিডের মাত্রা বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে।

•    যাদের ওজনাধিক্য রয়েছে তারাও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

•    যারা পানি কম পান করে তাদের এই রোগ হওয়ার আশঙ্কা আছে।

ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে উল্লিখিত শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।