বৃহস্পতিবার   ২১ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৬ ১৪২৬   ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

ঝালকাঠি আজকাল
৬২১

আইবিএস : পেটের এক অস্বস্তির নাম

প্রকাশিত: ১০ এপ্রিল ২০১৯  

 

ক্রনিক আমাশয় বলে একটি সমস্যাকে আমরা বাঙালিরা প্রায়শই ভুল করে থাকি সেটা হলো মলের সাথে অতিরিক্ত মিউকাস যাওয়া।মলের সাথে নিয়মিত অতিরিক্ত মিউকাস যাওয়া একটি সমস্যা বটে তবে এটি কোন মতেই ক্রোনিক আমাশয় নয়।

ক্রনিক আমাশায় নামে ভ্রম করে যে রোগটিতে আমরা ভুগি তার আসল নাম বলি। তার আসল নাম, ইরিটেবল বাউল সিনড্রোম( Irritable Bowel Syndrome)বা আইবিএস।

★এখন আসি আইবিএস কি?
ইরিটেবল বাউয়েল সিনড্রোম বা আই-বি-এস (IBS) ইনফ্লামেটরী বাউয়েল ডিজিজের একটি প্রকারভেদ এবং এটি আলসারেটিভ কোলাইটিস এবং ক্রন’স ডিজিজের মত নয়।

আমাদের অন্ননালী থেকে পায়ুপথ পর্যন্ত বিস্তৃত পথ ভিতর দিক থেকে একটি মূল্যবান ঝিল্লি দ্বারা আবৃত। এই ঝিল্লির ভেতরে গ্রন্থি আকারে নানান ধরণের কোষ থাকে।এক একটি কোষ একেক ধরণের কাজ করে থাকে। আমরা খাদ্য হিসাবে যেসব খাবার খাই তাকে সমন্বিত করে পরিপাক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মলে রূপান্তর করাই এইসব কোষের কাজ।তার মধ্যে একটি কোষ হচ্ছে মিউকাস নির্গতকারী কোষ বা(Mucous Secretory cell)এই কোষগুলোর কাজ হচ্ছে মলকে পিচ্ছিল করা যাতে মল অন্ত্রের গায়ে লেগে না থেকে নিচের দিকে নিঃস্ক্রান্ত হয়। এই মিউকাসের পরিমিত নিঃসরণের কারণেই মল তার স্বাভাবিক নরম চরিত্র নিয়ে পায়ুপথ দিয়ে নির্গত হয়। যদি আমাদের এই মিউকাস না থাকতো তাহলে মল ইটের মতো শক্ত হয়ে পায়ুপথকে ফাটিয়ে দিতো।

কিন্ত এই মিউকাস যখন বেশি ক্ষরণ হয় এবং সাথে দীর্ঘদিন ধরে পায়খানা সাধারণের তুলনায় নরম হয় তখন এটি একটি সমস্যা বটে।
আমরা যেসব খাদ্যদ্রব্য গ্রহন করি তার সহনশীলতা সবার এক রকম নয়। কেউ অখাদ্য কুখাদ্য সব কিছু খেয়ে সহজেই হজম করে ফেলি কেউ আবার বাছাই করা সব খাবার দাবার খেয়েও পার পাই না। এটি নির্ভর করছে অন্ত্র বা পরিপাক নালীর গঠনগত চরিত্রের উপর।আবার গঠনগত চরিত্র মোটাদাগে নির্ভর করে ব্যক্তিটির জিনগত বৈশিষ্ঠর উপর।এটা অনেকটাই পারিবারিক সূত্রে পাওয়া।তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা আক্রান্ত না হয়ে পরিবারের যে কোন ব্যক্তিই এ সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে।

★লক্ষণঃ
আইবিএসকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়, কোষ্ঠকাঠিন্যপ্রধান ও আমাশয়প্রধান। এর উপসর্গগুলো হলোঃ
*পায়খানার সঙ্গে অতিরিক্ত মিউকাস (চর্বিযুক্ত মল) যাওয়া।
*কোনো কিছু খেলে পেট ফুলে যেতে পারে।
*পেটব্যথা হয়, তবে তা মলত্যাগ বা বায়ু নিঃসরণের পর কমে যায়।
*শক্ত অথবা ছোট ছোট পিণ্ড আকারে মলত্যাগ হয় বা কোষ্ঠকাঠিন্য হয়।
*মলত্যাগের পরও তৃপ্তি না পাওয়া।মনে হউ সম্পূর্ণ হয়নি মলত্যাগ।
*ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হতে পারে।
*পেটের নিচের অংশের যেকোনো এক পাশে বা মাঝখানে ব্যথা বা পেটের ভেতর অস্বস্তি।পায়খানার পর পেটে স্বস্তি বোধ
*সকালের নাশতার পর দ্রুত মলত্যাগের চাপ অনুভব।

এ ছাড়া পেট ভরা ভরা লাগা, অতিরিক্ত বায়ু ত্যাগ, বদহজম, দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি, মাসিকের সময় ব্যথা এবং পুরো শরীর ব্যথা অতি পরিচিত উপসর্গ।

★কারণঃ
এই রোগের সঠিক কারণ জানা যায়নি। বিভিন্ন কারণে এটি হতে পারে। খাবার পাকস্থলী থেকে পরিপাকনালীর মধ্য দিয়ে বৃহদন্ত্রের শেষ অংশ বা মলাশয়ে যাওয়ার সময় অন্ত্রের প্রাচীর একটি নির্দিষ্ট ছন্দে সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংকোচন-প্রসারণ স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত হলে পেটে গ্যাস হয়, পেট ফেঁপে যায় এবং ডায়রিয়া হয়। আবার অন্ত্রের এই সংকোচন-প্রসারণ যদি স্বাভাবিকের তুলনায় ধীর হয়ে পড়ে তাহলে মল শক্ত হয়ে যায়। গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টাইনাল নার্ভাস সিস্টেমের অস্বাভাবিকতার কারণেও এই রোগ হতে পারে।

তবে আইবিএসের কারণ ও প্রভাবক হিসেবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা যে বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করেছেন দুটি ভাগে ভাগ করা যায়৷  ১.মনঃসামাজিক ও ২.শারীরবৃত্তীয়।

*মনঃসামাজিকঃ
মনঃসামাজিক কারণের মধ্যে আছে দুশ্চিন্তা ও হতাশা। এ ছাড়া হঠাৎ অতিরিক্ত মানসিক চাপও আইবিএসকে প্রভাবিত করে। দেখা গেছে, আইবিএসে আক্রান্ত রোগীরা অল্প সমস্যা হলেই মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তারা পরিস্থিতি সহজে মানিয়ে নিতে পারে না।

*শারীরবৃত্তীয়ঃ
১.বিভিন্ন ধরনের খাবার যেমন-চকোলেট, মশলা ও চর্বি যুক্ত খাবার, ফলমূল, সীম, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকোলি, দুধ ও বিভিন্ন কোমল পানীয় ইত্যাদি অধিক পরিমাণে খাওয়ার ফলে এই রোগ হতে পারে।
২.হরমোনগত পরিবর্তনের কারণেও এই রোগ হতে পারে
৩.অন্যান্য অসুস্থতা যেমন ইনফেকশাস ডায়রিয়া (গ্যাস্ট্রোয়েনটারাইটিস) বা অন্ত্রে অধিক পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া থাকলে এই রোগ হতে পারে।
৪.অন্ত্রের প্রতিরোধ ব্যবস্থার পরিবর্তন, অন্ত্রের নিজস্ব জীবাণুর পরিবর্তন।
৫.খাদ্যনালির কোনো সংক্রমণ ইত্যাদি।

★কারা বেশি ঝুকিপূর্ণঃ
*যাদের বয়স ৪৫ এর নিচে তাদের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
*একটি পরিবারের কোন সদস্যের ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম থাকলে অন্যান্য সদস্যদের ক্ষেত্রে এ রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
*বিভিন্ন মানসিক সমস্যা যেমন উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অস্বাভাবিক ব্যক্তিত্ব (Personality disorder), শৈশবে যৌন হয়রানির শিকার প্রভৃতি কারণে এই রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। মহিলারা পারিবারিকভাবে নির্যাতনের শিকার হলে তাদের এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
*জিনগত কারণেও এটি হতে পারে।

★কী কী পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগটা শণাক্ত করা যায়ঃ
*রক্ত পরীক্ষা (সিবিসি)।
*মলদ্বারে বিশেষ ধরনের যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা (কলোনস্কোপি, সিগময়ডোস্কপি)।
*থাইরয়েড হরমোন, মল পরীক্ষা,ল্যাক্টোজ ইনটলারেন্স আছে কিনা পরীক্ষা ইত্যাদি।
*বিশেষ এক্স-রে।

তবে কলোনস্কোপি, সিগময়ডোস্কপি অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে করানো উচিত। কারণ অনেক সময় মলদ্বার ও বৃহদন্ত্রের ক্যান্সার রোগীদেরও একই ধরনের উপসর্গ থাকে।

★চিকিৎসাঃ
এই সমস্যাগুলো ছয় মাসের বেশি থাকলে এবং মানসিক চাপের সময় এ ধরনের সমস্যা বেশি হলে চিকিৎসকরা আইবিএস হয়েছে বলে ধরে নেন। তখন মানসিক অস্থিরতা ও আচরণগত সমস্যা উভয়েরই চিকিৎসা করাতে হয়। মূলত শরীর থেকে মনের চাপ কমে গেলে সমস্যার অনেকটা সমাধান হয়।চিকিৎসার আগে প্রথম কাজ হলো রোগের মাত্রা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া।

-যাদের আমাশয়প্রধান আইবিএস রয়েছে তাদের লোপেরামাইড, অ্যামিট্রিপটাইলিন ইত্যাদি ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।

-যাদের পেটে ব্যথা ও বুটবুট আওয়াজের সমস্যা হয় তাদের মেবেভেরিন, অ্যালভেরিন ইত্যাদি ওষুধ দেওয়া হয়।

-যাদের কোষ্ঠকাঠিন্যপ্রধান আইবিএস তাদের ফাইবারযুক্ত খাবার (যেমন : শাকসবজি), ইসুপগুলের ভুসি, ল্যাকটুলোজ ইত্যাদি দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।

-কেউ উপরোক্ত উপায়ে ভালো না হলে অন্য বিকল্প উপায়ে বা অল্টারনেটিভ মেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসা নির্ধারণ করেণ চিকিৎসক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রিলাক্সেশন থেরাপি, হিপনোথেরাপি, বায়োফিডব্যাক ইত্যাদি।

★প্রতিরোধঃ

*আঁশযুক্ত খাবার খেতে হবে ।
*যে সব খাবার থেকে সমস্যা অনূভুত হয় তা এড়িয়ে চলতে হবে।
*সময়মত খাবার খেতে হবে।
*প্রচুর তরল খাবার থাকতে হবে খাদ্যতালিকায়।
*নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।
*সতর্কতার সাথে ডায়ারিয়ার ওষুধ ও ল্যাক্সেটিভ ব্যবহার করতে হবে।

★সতর্কতাঃ
এক গবেষণা থেকে দেখা গেছে, যেসব রোগীর দীর্ঘমেয়াদি লিভারে প্রদাহ এবং ফ্যাটি লিভার থাকে তাদের বেশির ভাগই কোনো না কোনো সময় আইবিএসে আক্রান্ত হয়। আবার যারা পায়খানার অভ্যাসের পরিবর্তন, পেট ফোলা, পেট ব্যথা বা অস্বস্তি, পেটে শব্দ, সুনির্দিষ্ট কিছু খাদ্য হজম না হওয়া জাতীয় সমস্যা নিয়ে আসে, তাদের প্রথম প্রথম আইবিএস হিসেবে সন্দেহ এবং চিকিৎসা করা হলেও পরে লিভার সিরোসিস ধরা পড়ে। সুতরাং একে অবহেলা করার সুযোগ নেই। তাই আইবিএস রোগীদের লিভারের কোনো সমস্যা আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা দরকার।

আবার আইবিএসের অনেক রোগী এনাল ফিশার, পাইলস ইত্যাদি রোগেও ভুগে থাকেন। এ ক্ষেত্রে পায়খানার রাস্তা দিয়ে রক্ত যেতে পারে, পায়খানার রাস্তা ফুলে উঠতে পারে, পায়খানার পর জ্বালা-যন্ত্রণা করতে পারে অথবা পায়খানার রাস্তা বের হয়ে আসতে পারে। তাই এসব বিষয়ে সতর্ক থেকে এনাল ফিশার এবং পাইলস রোগে তাদের অবশ্যই বৃহদন্ত্র ও মলদ্বারের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।